“জগত একটি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প এবং আমরা আসামী।”
পৃষ্ঠা-৪২
গল্পকার হিসেবে নাহিদ ধ্রুবর প্রবল শক্তিমত্তা সম্পর্কে আগে থেকে জানার পরও ‘হিম বাতাসের জীবন’ কেন এত বছর আমার চোখ এড়িয়ে গেছে সে যেন এক রহস্য।
মাত্র ৮০ পৃষ্ঠার দুই মলাটের মাঝে ২০টি স্বপ্ন কিংবা বিভ্রমে ভরা গল্প স্থান করে নিয়েছে এখানে।
ছোট ছোট বাক্যে, নন ট্র্যাডিশনাল কাব্যিক ভঙ্গিমায় গল্প, কবিতা, জীবন এবং চিত্রকল্পের মিথস্ক্রিয়ায় লেখক এমন সব জগৎ সৃজন করেছেন যেখানে আছে এমন বিষাদ, এমন নিষ্ঠুরতা, এমন অস্বস্তি, এমন লুকোচুরি, এমন জীবন, এমন মৃত্যু যা যেন এ ভুবনের হয়েও এ ভুবনের নয়।
গল্পগুলি আকারে ক্ষু্দ্র হলেও আমাদের চেতন ও অবচেতনকে বলে অনেক কিছুই, একইসাথে সক্ষম নাড়িয়ে দিতে। যেকোন ভালো কবির অল্পতে জাদু মিশিয়ে অনেক কিছু বলার ভঙ্গিমায় যেরূপ অতি সুন্দর গদ্যের মুখোমুখি পাঠক হয়ে যায়, সেই একই অভিজ্ঞতার চোরাবালি দিয়ে যাওয়া-আসা হবে পাঠকের এ বই দিয়ে।
জন্মান্ধ এক চিত্রশিল্পীর বুঝে ফেলা মানুষের স্বরূপ, স্বপ্নের ভেতরে স্বপ্নে কারো চরম অস্তিত্ত্বের সংকট, হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো এক অদ্ভুত জাদুকরের কীর্তিকলাপ, গুম-ধর্ষণ-খুনের সহজ-স্বাভাবিকতায় বিচারপতির কোপ খাওয়া শিক্ষকের রামদার, দাদীর মৃত্যুতে পুরো সংসারের পার্থিব কারণে ভাঙন, বোবা গায়কের শব্দহীন এক সুরের সৃজন, জীবন বিস্মৃত হতে রিজওয়ানের মরফিনের জন্য অপেক্ষা, এক শহরের সবার অদ্ভুত এক জাহাজে চড়ে পালানোর উদ্দেশে সম্মিলিত ও ছাড়া-ছাড়া নিষ্ঠুরতা, সামিয়া আর ধ্রুবর গাছ ফুলে ভর্তি হওয়ার পর ফুল বিক্রেতার কাছে দুজন বড় ক্রেতার আগমন যা আমাদের সামিয়া ও ধ্রুবর আপাত পরিণতি দেয় দেখিয়ে, নিখিলেশের ডাবল এজেন্টগিরির কারণে শত্রু এবং বন্ধু উভয়ের তালগোল পাকিয়ে জগতকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প হিসেবে দেখার মানবসুলভ চরম উপলব্ধি, ম্যাথিউর মায়ের হৃদয় নিংড়ানো হারিয়ে যাওয়া, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা এক সৈনিকের পাথরপুজারীদের কাছে এক দেবতা বনে যাওয়া, যে দেবতা নিজেই বিপন্ন, আমেরিকার প্রেসিডেন্টের চতুর্থ স্ত্রীর মৃত্যুতে কান্না করার জন্য ভাড়া করে এক পরিবার নিয়ে আসা, যেখানে শোকের আয়ু মাত্র তিরিশ মিনিট, অসচ্ছল মানুষজনের সচ্ছলদের বিরুদ্ধে করা বিপ্লব(!) হাতছাড়া হয়ে যাওয়া, অসচ্ছলদের নেতাদের হাতেই, মফিজ মিয়ার স্ত্রী ভাদ্রবধূর পলায়নপরবর্তী সম্মিলিত মানবমনের নির্মম আচরণ, যা আবার আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিকও, হামিমের জেলজীবনের পর শাস্তির দিকে এগুতে এগুতে দেয়ালকে অকৃত্রিম বন্ধু বানানো, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা চার সৈনিকের অদ্ভুত এক বাড়ির সদস্যদের মতো পরিণতি, মতিন মিয়া ও রাহেলার গল্প যা আসলেই নানামুখি অঘটনে প্রকৃতপক্ষে ‘যে পাড় ভেঙে দেয় নদী’, সংসার জীবনে অসুখী স্ত্রী যুবতীর আত্মহত্যায় স্বামী রুহেলের উপর প্রভাব, সবশেষে এমন এক গল্প যেখানে কাকের মতোই ক্রমশ বিলুপ্তি ঘটছে রাতের।
নাহিদ ধ্রুব তাঁর রেয়ার গল্প বলার আঙ্গিকে একইসাথে মানুষ ও প্রকৃতির যেরূপ মিশেল দিয়ে গেছেন ছোট ছোট গল্পের পরতে পরতে, সাবটেক্সট দিয়ে, লিরিক্যাল ভাষায়, পাঠকের মনে যেরকম দৃশ্যকল্প সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছেন, ক্রাফ্টিং-এ তাঁর লেখক হিসেবে পাকা হাত দেখাতে পেরেছেন, এরকম প্রতিভা, অ্যাম্বিশন, মানবমন ও জীবনের নানা মাত্রার বিষাদ ও সত্যকে ফুঁটিয়ে তুলার সামর্থ্য, লেখককে পাঠকের শ্রদ্ধা অর্জন করিয়ে দিবে বলে আমি মনে করি।
প্রতিটি গল্পে সচেতন পাঠকের ফিরে আসা হবে বারবার।
বই রিভিউ
নাম: হিম বাতাসের জীবন
লেখক: নাহিদ ধ্রুব
প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০
দ্বিতীয় প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ২০২১
প্রচ্ছদ: সিপাহী রেজা
প্রকাশক: চন্দ্রবিন্দু
রিভিউয়ার: ওয়াসিম হাসান মাহমুদ


