হারানো জগতে
বই রিভিউ
“এমন এক সময়ের গল্প এটা, হতে পারে পৃথিবীতে আরো বহু বছর কেটে গেছে। অতীতও হতে পারত, তবে অতীতের সাথে খাপ খায় না। বরং অন্যকোনো সময়। তবে নিকট ভবিষ্যৎ একেবারেই না। হতে পারে হাজারখানেক কিংবা লাখখানেক বছর পার হওয়ার পর। ঠিক কখন, সেটা স্পষ্ট করে কিছুই বলা যায় না। স্থান ও কাল দুটোর নির্দিষ্ট তারাই খুব ধোঁয়াটে। কিন্তু এই যে হাজার বা লাখখানেক বছরের উল্লেখ হলো, এ সময় পৃথিবীতে আসলে কী ঘটেছিল, সেটাও বলা যায় না। হতে পারে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। না-ও হতে পারে। কোনোভাবে টিকে ছিল।”
পৃষ্ঠা-০৯
অদ্ভুত সুন্দর সব গল্প লেখায় কুশল ইশতিয়াকের হাত কতটুকু ভালো তা ‘চাঁদগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে’ যারা পড়েছেন তারা সম্ভবত জানেন। একজন ভালো কবিতালেখক কিংবা কবি গল্প লিখতে বসে অল্প কথায় সাবলীলভাবে অনেককিছুই বলতে সক্ষম সেই ব্যাপারটা কুশল ইশতিয়াকের লিরিকাল ভাষার হাত ধরে এগিয়ে গেলে ভালো বুঝা যায়।
মাত্র ৭২ পৃষ্ঠার ‘হারানো জগতে’ ১৪টি গল্প আঁটিয়েছেন লেখক। সত্যিই যেন হারানো কোন এক জগতের দিকে যাত্রা করতে থাকবেন পাঠক এ বই পড়ার সময়। কখনো কখনো মনে হবে বিষণ্নতা, নির্লিপ্ততা ও অদৃষ্টের বাঁধনে জড়ানো গল্পগুলি কেন শেষ হয়ে যাচ্ছে?
প্রথম প্যারায় নবম পৃষ্ঠার কথাগুলো যেন প্রায় সব গল্পের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য এক কমন থিম হয়ে উঠে এসেছে। হারানো জগতের সময়রেখা অজানা। ‘ফুল’ গল্পে স্বপ্ন ও রিয়েলিটির মাখামাখি রঙে জেডের প্রথম দেখা পাই আমরা। ‘আন্ধারমানিকের গল্প’এ আন্ধারমানিকের ছয়মাস অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে থাকার কারণ জানতে গিয়ে দেখা পাই আমরা সোলেমান নবি, গুপ্তধন, বড় সাপ ও পাতালের এক অজ্ঞাত জগতের। জেড ফিরে আসে ‘পাহাড়ে ওঠা’ গল্পে। অতিদ্রুত সৃষ্টি হওয়া কুয়াশায় জেড ও জেডের স্ত্রী পি এর হারিয়ে যাওয়াটা মনে সৃষ্টি করে এক নিগুঢ় রহস্যের। ‘পলিন’ গল্পে লেখক নিজেই আছেন। রিপিটেশনের গল্পটি কি আসলেই স্বপ্নের? বইয়ের শেষ গল্প ‘অশ্বিনী তারার গল্প’এ আমরা আবার কুশল আর পলিনকে ফিরে পাই।
এই গল্পবইয়ে কিছু কিছু চরিত্র ফিরে ফিরে আসে, যেমন: জেড। আবার জুলহাসও। জুলহাস কি জেড দিয়ে লেখা যায়? কোন কোন গল্প আরেকটির সাথে কানেক্টেড কিংবা একটি আরেকটির এক্সটেনশন।
‘একজন ফুলবিক্রেতার জীবন’ সাধারণ থেকে অসাধারণ প্রায় সবার চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার কি সুন্দর গল্পটাই না বলে। আবার আমরা ‘তিন ভাই’ গল্পে কালো কোট-প্যান্ট-জুতোয় সাজানো তিনজন ভ্যাগাবন্ডকে খুঁজে পাই। যাদের কমন ব্যাপার কিন্তু শুধুমাত্র ঐ পোশাক নয়। ‘জুলহাসের মৃত্যু’ ও ‘শাস্তি’ গল্প দুটি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এই দুটো গল্প মনের মাঝে পরিচিত এবং অপরিচিত জগতের মিথস্ক্রিয়ায় সৃষ্ট এক অদ্ভুত অনুভূতির দেখা দেয়।
এ বইয়ে আমার খুব সম্ভবত সবচেয়ে প্রিয় গল্পের নাম ‘আমি যা দেখি, তুমি কি তা দেখ’। তপু নামের অসচরাচর স্বভাবের ছেলেটি স্নীগ্ধা আপুর কাছে টিউশন নেয়। যে স্নীগ্ধা আপু সৌন্দর্যে যেন এ জগতের নয়। তপুও অবশ্য ভিন্ন জগতের। কুশল কত চমৎকারভাবে সাবটেক্সট দেন। গল্প শেষে সফলতার সাথে পাঠকমনে বিষণ্নতার সৃজন করেন।
এ বইয়ের কিছু লাইন মনের মাঝে সত্যের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যায়,
“অদৃষ্ট যখন নিজের শক্তি প্রকাশ করে, তখন আমাদের খুব বোকার মতন লাগে। মায়াও হয়।”
পৃষ্ঠা-১৪
‘চক্র’ গল্পে উল্কার সাথে পৃথিবীর অতি প্রাচীন এক সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করা হয়,
“পৃথিবীর গল্পটা আসলে উল্কার একটি চক্রে বাঁধা।”
পৃষ্ঠা-৫৪
“শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্নটি ধেয়ে আসা উল্কার মতো, এমন একটি কথা রক্তের মধ্যে প্রায়ই মনে পড়বে তাদের।”
পৃষ্ঠা-৫৫
অতি বুদ্ধিমান প্রাণীরও উইশফুল থিঙ্কিং-এর সাথে পর্যবেক্ষণ গুলিয়ে ফেলার সেই চিরাচরিত প্যারাডক্স যেন আবার ফিরে আসে।
‘ফুল’ গল্পের বর্ধ্বিত রূপ যেন ‘দ্য সেকেন্ড আর্থ’। পাঠক গল্পটি পড়াকালে ফিরে যাবেন আবার সেই প্রথম গল্পে।
‘কাগজে আঁকা চাঁদ’এ আমরা আবার ফিরে পাই প্রিয় তপুকে।
“তপু খেলছে। এ অর্ধেক সত্যি, অর্ধেক আঁকা পৃথিবীতে। এর আগেরবার কী হয়েছিল ঠিক মনে পড়ে না। আগেকার কোন স্মৃতি অবশিষ্ট নেই। বোধহয় আকাশটা ভেঙে পড়েছিলো। ভাবতে ভাবতে ভাবি, এবার আর আকাশটা নিশ্চয় ভেঙে পড়বে না।
ভাংবে কীভাবে? এবারেরটা তো কাগজে আঁকা। সুন্দর।”
পৃষ্ঠা-৫৯
‘দ্য মিথ’ গল্পে আবার জেডের উল্লেখ পাই আমরা। বষন্তকালে স্নিগ শহরে কেন এত বৃষ্টিপাত? ডেসিলাসের কাছ থেকে বৃষ্টিতে কাঁক ভেজা হওয়া দুজনের মতো পাঠক জেনে নেবেন।
‘অশ্বিনী তারার গল্প’ মূলত ‘পলিন’এর এক্সটেনশন। মেমরিতে তাঁকালে কুশল অতীতের সাথে সাথে ভবিষ্যতও দেখতে পান। আমরা কেউ কেউ কি পারি?
কুশল ইশতিয়াকের গল্প বলাটা আসলেই অন্যরকম। ছোট-ছোট বাক্যে পাঠকের মনের অন্দরে ছাড়া-ছাড়া কিছু ফিল্মের কিংবা কাঁচা হাতে তুলা সেল্ফির মতো ঝাপসা-ঝাপসা অথবা ধোঁয়াটে কিছু ছবির আসা-যাওয়া চলতে থাকবে পুরো বই জুড়েই। আবার সেইসব ছবি যেন কোথায় গিয়ে আবার ঠিক বিচ্ছিন্ন নয়।
পাঠকমন হয়তো বুঝতে পারবে আমাদের যার যার অবচেতনে লুকিয়ে আছে এক বা একাধিক হারানো জগত।
বই রিভিউ
নাম: হারানো জগতে
লেখক: কুশল ইশতিয়াক
প্রথম প্রকাশ: একুশে গ্রন্থমেলা ২০২১
প্রচ্ছদ: ফাইজা ইসলাম
প্রকাশক: চন্দ্রবিন্দু
রিভিউয়ার: ওয়াসিম হাসান মাহমুদ


