অমল ধবল চাকরি
বই রিভিউ
‘রফিক, তোর চাকরি গেছে তুই জানিস?’
উপন্যাসের শুরুটা হয়েছে এভাবে। তারপর এগিয়ে গেছে তরতরিয়ে। ঢাকা শহরের আধুনিক বুমার্স প্রজন্মের এক একটা গল্প কখনো আঁটোসাঁটো হয়ে আবার কখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পুরো ‘অমল ধবল চাকরি’জুড়ে।
রফিক, রকিব, ফরহাদ, টুনু, শাহনেওয়াজ ও কেয়া মির্জার এক ফ্রেন্ড সার্কেল ছিলো। ক্রমে বন্ধুরা জীবনের নির্মম কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে সরে সরে যেতে থাকে। বৃত্ত পরিবর্তিত হতে থাকে।
নভেলের সময়রেখা ১৯৭৭ সালের। বেশিরভাগ সময় রাহাত খান আখ্যানের স্থান রেখেছেন ঢাকা। সচেতন পাঠক এ কারণে তৎকালীন ঢাকার কিছু ঝলকে চোখ বুলাতে পারবেন।
সময়ের সাথে বন্ধুরা পাল্টায়, পাল্টায় জীবনের অবস্থান। সেই পরিবর্তিত অবস্থান যাপনে বিভ্রান্ত মানুষ ক্রমাগত যেন অভিনয় করে যেতে থাকেন শহুরে বাস্তবতায়, নাকি করেন না?
উপন্যাসটি পড়ার সময় আমার মনে হয়েছে জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের অন্যতম প্রিয় লেখক সম্ভবত রাহাত খান। অনেকে বলেন কাজী আনোয়ার হোসেনের সৃজনকৃত মেজর জেনারেল রাহাত খানের নামটি এই লেখকের থেকে নেয়া।
ছোট ছোট বাক্যে প্রাঞ্জল, গতিশীল ভাষায় রাহাত খানের লেখনি এগুতে এগুতে বিভিন্ন সময় প্রকৃতি ও মানবপ্রকৃতি বর্ণনায় আশ্চর্যজনক সুন্দর গদ্যের দেখা দেয়।
কেয়া মির্জার প্রতি তাঁর প্রায় সব বন্ধুর দুর্বলতা পরবর্তিতে নাজিরের সাথে কেয়ার সম্পর্কস্থাপন, সেই রিলেশনশীপের এক তীব্র অস্বস্তির কারণ আমাদের এ উপন্যাসের নামটি-ই মনে করিয়ে দেয়।
‘অমল ধবল চাকরি’তে আছে স্বপ্নবাজ ফরহাদ, যার মাথায় ঘুরে লাখলাখ টাকা নিয়ে সুচিত্রা সেনের সাথে ডেটে যাওয়ার কল্পনা এমনকি বাড়ি ভাড়া তিনমাসের বাকি থাকা অবস্থায়ও। আছেন বিপত্মীক রকিব, মা-হারা নিজ সন্তানকে যে এমন বাঘ শিকারের গল্প বলে যেখানে বাঘের পক্ষ নিতে ইচ্ছা করে। আছেন টুনু, ইন্টারকনের সামনে সুন্দরী বিদেশিনী জুলিয়ার আপাতত নিয়োগপ্রাপ্ত গাইড। আমরা কর্পোরেট জগতে যাদের সার্ক বলি এরকম একজন ‘পাগলা নাজির’, কেয়ার জন্য যার পাগলামি তুঙ্গে। রহস্যময় কস্তুরী যার স্বামীকে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে ফেরাতে হয়।
‘অমল ধবল চাকরি’তে সত্য-সুখ-স্বাধীনতার সন্ধানে জার্মানি থেকে আসা জুলিয়া ও রফিকের চোখ দিয়ে আমরা দেখতে পাই যৌথ পরিবারের ভাঙন, সুখি দম্পতির বিচ্ছেদের করুণ সুর আমাদের কানে এসে ঠেকে। তৎকালীন সমাজব্যবস্থার কখনো হতাশা আবার কখনো আশ্চর্যজনক পরিবর্তনগুলি রাহাত খানের লেখালিখির হাত ধরে আমাদের স্পর্শ করে।
মানবজীবনে পরিবর্তনই হয়তো ধ্রুব সত্য। সেই পরিবর্তনের সাথে তৎকালীন তরুণ প্রজন্মের বোঝাপড়া, রিয়্যাকশনারী আচার-আচরণ বুঝার জন্য এ উপন্যাস অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম।
গল্পে কোন মিল না থাকার পরও আমার ‘অমল ধবল চাকরি’ পড়ার সময় কেন জানি কখনো কখনো হিন্দি চলচ্চিত্র ‘দিল চাহতা হ্যায়’এর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো, তেমন মিল না থাকার পরও। হয়তো পুরো নভেল যৌবনের গল্প-ই বলে চলে শুধু, এ কারণেই।
রফিক চাকরি চলে যাওয়ার পরও চাকরি খুঁজে পেতে প্রবলভাবে তৃষ্ণার্ত, যা তাকে হিমু হওয়া থেকে রক্ষা করেছে। কস্তুরীকে সিনেমার নায়িকা হয়ে উঠতেই হয়, স্বামীর চাপে। রকিবকে বলে যেতে নিজ সন্তানকে বাঘের গল্প, কল্পনায় ডুবে থাকতে হয় ফরহাদকে। জুলিয়া পৃথিবীজুড়ে খুঁজে ফিরে সত্য আর আনন্দকে। এসব কি যাপনের চাকরি নয়?
হোটেল ইন্টারকনে নাজিরের নিজস্ব স্যুটে কেয়া মির্জাকে এক ইন্টিমেট অবস্থায় বলে ফেলতে হয় তাদের বিয়ে হবে না কারণ একটি পুরো পরিবারের দায়িত্ব কেয়ার উপর।
আমার কাছে উপন্যাসটির ডিফাইনিং মোমেন্ট মনে হয়েছে হোটেল ইন্টারকনে কেয়া আর নাজিরের সেই ইন্ট্যারেকশন।
কারণ যাপনে আমাদের সবার মতোই কেয়া মির্জাকে করে যেতে হবে অমল ধবল চাকরি।
বই রিভিউ
নাম: অমল ধবল চাকরি
লেখক: রাহাত খান
প্রথম প্রকাশ: মার্চ, ১৯৮২
ব্রেনফিভার সংস্করণ: জানুয়ারি, ২০২৬
প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত
গ্রন্থসজ্জা: শুভঙ্কর মাজি
বিশেষ কৃতজ্ঞতা: আজরফ ইসলাম অর্ক
প্রকাশক: ব্রেনফিভার প্রকাশনা
রিভিউয়ার: ওয়াসিম হাসান মাহমুদ


